বিশেষ করে রেফ্রিজারেটর, ফ্রিজার ও এয়ারকন্ডিশনারের মতো পণ্য উৎপাদনকারী, নতুন উদ্যোক্তা এবং বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকির মুখে পড়ছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের। তাদের ভাষ্য, ২০১৯ সালের পর এ খাতে শিল্প-কারখানা স্থাপনে নতুন উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের দেয়া অব্যাহতি সুবিধা প্রত্যাহার এবং একপেশে নীতির কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার কর্তৃক বারবার নীতি পরিবর্তন করে কর-শুল্ক সুবিধা প্রত্যাহার এবং নতুন করে উচ্চহারে কর আরোপ এ খাতে আর্থিক সংকট তৈরি করছে।
জানা যায়, ২০১০ সালের আগে এসব পণ্য মূলত সিকেডি ও সিবিইউ আকারে আমদানি হতো এবং ট্যারিফ ব্যবধান ছিল সীমিত। তবে ওই সময় থেকে কিছু প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিয়ে অস্বাভাবিক শুল্ক কাঠামো প্রণয়ন করা হয়, যা স্থানীয় উৎপাদনের নামে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে দীর্ঘদিন একক সুবিধা দিয়েছে। পরবর্তী সময়ে সমালোচনা মুখে সরকার ইলেকট্রনিকস খাতে বৈষম্যমূলক ও ভোক্তা স্বার্থবিরুদ্ধ শুল্ক, করহার বা ট্যারিফ কাঠামো কিছুটা সংশোধন করে। ফলে এ খাতের বেশ কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সিকেডি শিল্প খাত থেকে সরে এসে উল্লেখিত প্রজ্ঞাপনের আওতায় পণ্য উৎপাদনের জন্য শিল্প স্থাপনে উদ্যোগী হয়।
২০১৯ সালের এসআরও অনুযায়ী, আয়করে ১০ শতাংশ সুবিধা এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ভ্যাট ছাড়সহ বিভিন্ন প্রণোদনা দেয়া হয়। এসব সুবিধার ওপর ভর করেই নতুন উদ্যোক্তারা বড় অংকের বিনিয়োগ করেন। কিন্তু শিল্প স্থাপনের পর ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে এসব সুবিধা বাতিল করে নতুন শর্ত আরোপ করা হয়। এরপর ২০২৫ সালের নতুন প্রজ্ঞাপনে আয়কর হার ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ, স্থানীয় পর্যায়ে ভ্যাট ১৫ শতাংশ এবং আমদানিতে অগ্রিম কর ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়।
উল্লেখ্য, কয়েকটি পণ্যে সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার করায় সেসব পণ্যের স্থানীয় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বলে বিশেষ সুবিধাভোগী কিছু প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের কাছে যে অপপ্রচার চালাচ্ছে তা সম্পূর্ণ অমূলক। কারণ এসব পণ্যে ২৫ শতাংশ শুল্ক, ৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, ১৫ শতাংশ মূসক, ২ শতাংশ আগাম কর ও ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর বিদ্যমান আছে, বিধায় তা স্থানীয় উৎপাদনের জন্য সম্পূর্ণ অনুকূল।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব ইলেকট্রনিকস খাতে পড়েছে জানিয়ে খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণ্যিজের প্রধান সমস্যা হচ্ছে জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি, বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ পরিস্থিতি, বিপর্যস্ত সরবরাহ ব্যবস্থা, মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, আমদানি মূল্য বৃদ্ধি, সাধারণ মানুষের আয়ের চেয়ে ব্যয় বৃদ্ধি, বেকারত্ব ইত্যাদি। এ অবস্থায় স্থানীয় শিল্পকে ট্যারিফ সুবিধা দিয়ে ব্যবসা পরিচালন ব্যয় কমানো এবং শুল্ক ও কর পদ্ধতি সহজ করে দেশে ব্যয় সাশ্রয়ী ও প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদনের পরিবেশ তৈরি করাই একমাত্র উপায়। চলতি বাজেটে এ ব্যাপারে বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া হলেও কতিপয় শিল্পক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যার নিরসন না করে বরং তা আরো জটিল করা হয়েছে বলেও দাবি তাদের।
জানা যায়, এ শিল্প খাতের প্রায় ৮৫-৯০ শতাংশ কাঁচামাল, খুচরা যন্ত্রাংশ ও উপকরণই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এতে বিগত কয়েক বছর অব্যাহতি হারে শুল্ক-কর ছাড় দিয়ে আসছে সরকার। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে এ শুল্ককরের হার প্রায় দ্বিগুণ করা হয়। ফলে অগ্রসরমাণ এ শিল্প খাতের বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে রেফ্রিজারেটর ও ফ্রিজের কমপ্রেসরের মূল্য ক্যাপাসিটি ভেদে ১৯ থেকে ২৬ ডলার। আর এয়ার কন্ডিশনারের কমপ্রেসর ২৫ থেকে ৪০ ডলার। প্রস্তাবিত বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আন্তর্জাতিক স্বাভাবিক মূল্যকে উপেক্ষা করে তাদের প্রজ্ঞাপনে ফ্রিজের কমপ্রেসরের মূল্য ধার্য করেছে ৪০ ও ৬৫ ডলার। আর এসির কমপ্রেসর ৫০ ও ৮৫ ডলার। আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে অনেক বেশি মূল্য ধার্য করায় এতে বাণিজ্যের আড়ালে বিদেশে মুদ্রা পাচারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাছাড়া আমদানি পণ্যের মূল্য বিষয়ে ডব্লিউটিওর চুক্তি এবং বাংলাদেশ কাস্টমস আইনে আন্তর্জাতিক স্বাভাবিক মূল্যের বাইরে গিয়ে মূল্য ধার্য করার সুযোগ নেই। ফলে প্রকৃত মূলের চেয়ে বেশি মূল্য ধার্য করায় এতে ফ্রিজ, এসির উৎপাদন ব্যয়ও অনেক বৃদ্ধি পাবে। কাজেই কমপ্রেসরের ধার্যকৃত ন্যূনতম মূল্য প্রত্যাহার অথবা অন্তর্জাতিক মূল্যভিত্তিক করার জন্য অনুরোধ শিল্পসংশ্লিষ্ট সব উদ্যোক্তার।
এদিকে বন্দর ও কাস্টমস ব্যবস্থাপনার জটিলতা ব্যবসায়ীদের জন্য আরেকটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি চালান কায়িক পরীক্ষা, বিলম্ব, ড্যামারেজ চার্জ এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে সময় ও ব্যয় বাড়ছে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যুদ্ধ পরিস্থিতি, সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্ন, মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির মতো চ্যালেঞ্জের মধ্যেও শিল্প খাতকে টেকসই করতে নীতিগত স্থিতিশীলতা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা বলছেন, এ খাত এরই মধ্যে আমদানি বিকল্প শিল্প হিসেবে গড়ে উঠছে এবং ভবিষ্যতে রফতানিমুখী খাতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ অবস্থায় আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল নীতি প্রণয়ন, শুল্ক-কর হ্রাস, ন্যূনতম মূল্য প্রত্যাহার, সহজ কাস্টমস প্রক্রিয়া এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ সুবিধা এবং ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। টেকসই ও পূর্বানুমানযোগ্য নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত না হলে এ খাতে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সম্ভাব্য রফতানি আয় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।